img
Home / আমিও লিখি / চেনা ভীড়ে একাকী

চেনা ভীড়ে একাকী

চির চেনা এই ঢাকা শহরে মানুষের সংখ্যা লক্ষ ছাড়িয়ে কোটির ঘরে পৌঁছিয়েছে সেই কবেই। জড়াজড়ি করে গড়ে ওঠা উঁচু নিচু দালান কোঠা, বিলাস বহুল আধুনিক সুউচ্চ এপার্টমেন্ট, কোল ঘেঁষা এক একটি মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত আবাসন, গলি ঘিঞ্জি বস্তি, নোংরা, স্যাঁতসেঁতে ছাপড়া ঘর… সব মিলিয়ে কেবল অগনিত মানুষের বসবাস।

বাস, ট্রাক, টেম্পু, রিকশা থেকে শুরু করে প্রাডো, পাজারো কিংবা দুরন্ত বাই সাইকেল। ঝাঁ চকচকে স্বচ্ছ কাঁচের লিফট, চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলকানির আলিশান শপিং মল থেকে জরাজীর্ণ মনোহরী দোকান, ফুটপাত, ভ্যান অথবা মাথায় ঝাঁকা নিয়ে শ্রান্ত পায়ে হেঁটে যাওয়া ফেরিওয়ালা মামা। ফাইভ স্টার, থ্রি স্টার, স্পেশাল ডাইন, আকর্ষণীয় ফুড কোর্ট, নিরিবিলি রিসোর্ট কিংবা টং দোকান, ভ্রাম্যমাণ রুটির ঠেলাগাড়ি, ছাপড়া হোটেলের ঘরোয়া পরিবেশের টেবিল চেয়ার…যে দিকে দৃষ্টি যায়, কেবল অগণিত মানুষ আর মানুষ। কালো কালো অসংখ্য মাথা।

অথচ এই ব্যস্ত নগরীতে চেনা মানুষের বড়ই অভাব। একি রাস্তায় একি সময় হেঁটে গেলেও কদাচিৎ পরিচিত মুখের সন্ধান মেলে, কখনো বা মেলেই না। গলি থেকে রাজপথ, হসপিটাল থেকে অফিসপাড়া,  ব্যাংক থেকে সিনেমা হল কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না একটি পরিচিত নির্ভরতার মুখ।

পাশের বাসায় বাচ্চার কান্নার আওয়াজে বুঝতে পারি নবজাতকের আগমন, অথচ শিশুটির নামটা পর্যন্ত জানা হয়না অনেক সময়। দূরের এপার্টমেন্ট এর গ্রীলে মাথা রাখা তরুনীটির গালে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার দাগ হয়ত আমরা দেখতে পাই, কিন্তু জানতে পারিনা তার যন্ত্রনায় দগ্ধ হওয়ার কারন, জানতে চাই না বলেই। গভীর রাতে ল্যাম্পপোস্ট এর পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে হেঁটে আসা ক্লান্ত যুবকটির হতাশার অতল খুঁজতে যাই না আমরা। গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগা মানুষটার চেহারা না দেখে কেবল দুই অক্ষরের “সরি” শব্দ টা বলেই আমরা আমাদের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতে চাই। আজ আর কারো আনন্দ আমাদের উদ্বেলিত করে না, কারো  কষ্টে আমরা এখন আর খুব একটা ব্যথিত হই না। এই শহরে আমরা কেউ কারো নই, কারো জন্য কারো প্রাণ কাঁদে না, মন ছটফট করেনা।

এই শহরে হয়ত রক্তের সম্পর্কের মানুষের অভাব নেই, নেই হয়ত আত্মার সম্পর্কের মানুষের অভাব। কিন্তু তবুও অনেক ক্ষেত্রে দূরত্ব, সময়, বাস্তবতা, পরিস্থিতি, দায়িত্ব কর্তব্যের বেড়াজাল, ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও কাছের মানুষ গুলোকে পাশে থাকতে দেয় না, তাই তো লাগামহীন ব্যস্ততার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলে সীমাহীন একাকিত্ব।

তাই, তীব্র অসহায় মুহূর্তে হসপিটালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন চোখের কোনে অশ্রু জমে, তখন তা মুছিয়ে দেওয়ার জন্য মাঝে মাঝে কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায় না। ক্লান্তিতে, শ্রান্তিতে যখন হাঁটু ভেঙে আসে, তখন কাঁধে একটা বলিষ্ঠ হাতের অভাব টা যেন দূর করা যায় না কোন ভাবেই। তাই হয়ত, নিজেরই ডান হাত দিয়ে বাম চোখ মুছে সেই হাতেই কলম ধরে অস্ত্রপোচারের অঙ্গীকার নামায় স্বাক্ষর করতে হয় একাই। নিস্তব্ধ বারান্দায় দাঁড়িয়ে বুক কাঁপলেও মন কে শক্ত পাথর করতে হয়। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে গিলে খেতে বাধ্য হতে হয় গলার কাছে জমে থাকা কান্নার সব টুকু উড়ান। চেহারায় বিষন্নতার ছাপ মুছে ঠোঁটের কোনে কৃত্তিম হাসির রেখা টেনে বাবা মায়ের সামনে দাঁড়াতে হয়, আর কিছু করার থাকেনা বলেই।

আর যখন গলার স্বরে সব টুকু স্বাভাবিকতা এনে জটিল বিষয় গুলোকে হালকা করেই কাছের মানুষ গুলোর সামনে উপস্থাপন করতে হয় তখন নিজের কাছেই মনে হয় অনেক টা বড় হয়ে গেছি, অনেকটাই! সেই দুরন্ত, খামখেয়ালি,  ডানপিটে মেয়েটার ছোট্ট কাঁধে এখন পাহাড় সম দায়িত্ব, যে কিনা নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা কামিজও কিনতে পারেনা, সেই অতি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা মেয়েটা আজ কি অবলীলায় জীবনের কঠিন সব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছে, অস্ত্র-প্রচার, রক্ত দান, পরীক্ষা নিরীক্ষা,  ঔষধ,  পথ্য আরো কত কি…!

আসলে লক্ষাধিক মানুষের ভিড়ে কোন কোন একাকিত্বের কোন মানেই হয়ত হয়না, কোন কোন সময় নিঃসঙ্গতায় সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে যায়, আর তাই তো হসপিটালের হাজার মানুষের মাঝে, নিষ্ঠুর নিঃসঙ্গতা কে টুপ করে গিলে খেয়েই উঠে দাঁড়াই, দাঁড়াতে হয়…! সমস্ত একাকিত্বের জীর্ণতা কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগিয়ে যাই… প্রিয়জনের সুস্থতার তাগিদেই, বেঁচে থাকার প্রেরণায় !

Comments Below

comments

  • Facebook
  • Twitter
  • Google+
  • Pinterest
  • stumbleupon